মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্লোরিডার মার-আ-লাগো রেসিডেন্সে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভেনেজুয়েলায় পরিচালিত সামরিক অভিযান এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার বক্তব্যে জানান যে নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে নিউ ইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হবে, যেখানে তাদের বিরুদ্ধে সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট অব নিউ ইয়র্কে "মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ও বিস্ফোরক ডিভাইস ব্যবহারের ষড়যন্ত্র, মাদক-সন্ত্রাসবাদ এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধ"-এর অভিযোগ আনা হবে। করাকাসের সামরিক অবকাঠামো ও কমান্ড সেন্টারগুলোর উপর হামলার প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন জানিয়েছে, তারা ভেনেজুয়েলায় সাময়িকভাবে ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং একইসঙ্গে তেল আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখবে। সেইসঙ্গে, মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলোর স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। ওপেন সোর্সের তথ্য অনুযায়ী, রাতের বেলায় করাকাস এবং ভেনেজুয়েলার একাধিক অঙ্গরাজ্যে এই হামলা পরিচালিত হয়, যার ফলে দেশজুড়ে ব্যাপক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা এবং সামরিক অবকাঠামোগুলোর বড় অংশ অকার্যকর হয়ে পড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এটিকে সামরিক শক্তির অন্যতম সফল প্রদর্শনী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে এবং মাদুরোকে গ্রেফতারের সময় মার্কিন সেনাবাহিনী ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সমন্বিত অভিযানকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে। ট্রাম্প প্রকাশ্যেই জোর দিয়ে বলেন যে, মাদুরো এবং সিলিয়া ফ্লোরেস "মার্কিন বিচারব্যবস্থার মুখোমুখি হবেন" এবং যুক্তরাষ্ট্র "ভেনেজুয়েলাকে পরিচালনা করবে" যতক্ষণ না দেশটিতে "নিরাপদ ও সুষ্ঠুভাবে ক্ষমতা পরিবর্তনের" প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়—এই বক্তব্য কার্যত ভেনেজুয়েলায় বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। পাশাপাশি, তিনি দ্বিতীয় ধাপের হামলার প্রস্তুতির কথাও জানান, যা অঞ্চলটির অভ্যন্তরে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতির সংকেত বহন করে। মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পামেলা বন্ডি জানান, নিকোলাস মাদুরো এবং সিলিয়া ফ্লোরেসের বিরুদ্ধে সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট অব নিউ ইয়র্কে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—মাদক-সন্ত্রাসবাদে জড়িত থাকার চক্রান্ত, যুক্তরাষ্ট্রে কোকেইন পাচার, এবং অবৈধভাবে ভারী অস্ত্র ও বিস্ফোরক ডিভাইস পরিবহন করার অভিযোগ। ২০২০ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে যেসব মাদকপাচার ও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে মামলা চলমান রয়েছে, সেই নীতির ধারাবাহিকতায় এই অভিযোগগুলো তুলে ধরা হয়েছে। সেই সময় মাদুরোকে গ্রেফতারের জন্য তথ্যদাতার প্রতি পুরস্কার ঘোষণাও করা হয়েছিল। ভেনেজুয়েলার সরকার এক কঠোর সরকারি বিবৃতি প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে "একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে স্থূল সামরিক আগ্রাসন" হিসেবে অভিহিত করেছে। তারা করাকাসসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যজুড়ে সাধারণ জনগণের উপর হামলার নিন্দা জানায়। ভেনেজুয়েলার মতে, এই আক্রমণ জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন—বিশেষ করে, এই হামলা সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রসমূহের সমতা, এবং বলপ্রয়োগের নিষেধাজ্ঞার মতো নীতিবিরুদ্ধ। তারা ল্যাটিন আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকির কথা উল্লেখ করে সতর্ক করে দিয়েছে। ভেনেজুয়েলার দৃষ্টিতে এই সামরিক অভিযানকে দেশটির কৌশলগত সম্পদ—বিশেষত: তেল এবং খনিজ সম্পদের উপর জোর করে দখল প্রতিষ্ঠার একটি প্রচেষ্টারূপে দেখা হচ্ছে এবং এটি তাদের রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে ধ্বংস করার প্রক্রিয়া বলেও মনে করা হচ্ছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট মাদুরো জাতীয় সুরক্ষা পরিকল্পনার পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন—যা ওয়াশিংটনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি দ্বন্দ্বমুখী কূটনৈতিক অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।
ভেনেজুয়েলা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেলের মজুদসম্পন্ন দেশ হলেও, বিগত কয়েক বছরের নিষেধাজ্ঞা এবং বিনিয়োগের ঘাটতির কারণে দেশটির তেল উৎপাদন নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তরের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলে—দেশটিতে তেল উৎপাদন পুনরায় চালুর একটি সুযোগ তৈরি হবে, বিশেষ করে যদি এটি মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনায় অথবা তাদের অংশগ্রহণে পরিচালিত হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে ভেনেজুয়েলার তেলক্ষেত্রে প্রধান মার্কিন কোম্পানিগুলোর প্রবেশাধিকার দেওয়া হবে। একদিকে, নিষেধাজ্ঞা আনুষ্ঠানিকভাবে বজায় রেখে ভেনেজুয়েলার উপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার মাধ্যমে ওয়াশিংটন দেশটির তেলক্ষেত্রগুলোতে বেছে বেছে প্রবেশাধিকার প্রদান এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদে —যেমন রাশিয়া ও ইরানের—উপর চাপ প্রয়োগের একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এটি চলমান প্রতিযোগিতার মধ্যে বিশেষভাবে ভারী গ্রেডের অপরিশোধিত তেলের শেয়ারের জন্য গুরুত্ব বহন করে। মধ্যমেয়াদে, যদি অন্য অঞ্চলগুলো থেকে সরবরাহ হঠাৎ হ্রাস না পায়, তাহলে ভেনেজুয়েলার উৎপাদন পুনর্বহাল এবং আংশিকভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ বেড়ে যেতে পারে এবং এর ফলে তেলের মূল্যের নিম্নমুখী প্রবণতা সৃষ্টি হতে পারে। ভেনেজুয়েলার তেল সরবরাহ এবং এর লেনদেনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার হওয়ার অর্থ হলো—বহুল ব্যবহৃত বাণিজ্য পণ্যগুলোর লেনদেনের ক্ষেত্রে মূল মুদ্রা হিসেবে মার্কিন ডলারের অবস্থান আরও সুসংহত হবে, বিশেষ করে যদি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার শর্ত হিসেবে মার্কিন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার (সুইফট, চুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিং ইত্যাদি) ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে দেওয়া হয়। এই পরিস্থিতিতে ডলারে লেনদেনের পরিমাণ বাড়ার ফলে ডলারের চাহিদা বাড়বে, পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার তেল খাত পুনর্গঠনের সঙ্গে জড়িত ঋণ ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ কর্মকাণ্ডেও মার্কিন ডলারের গুরুত্ব বাড়বে। অন্যদিকে, সামরিক অভিযান এবং ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি বৃদ্ধির কারণে নিরাপদ অ্যাসেট যেমন মার্কিন ডলার এবং মার্কিন ট্রেজারিজের আকর্ষণ বাড়বে, যা স্বল্পমেয়াদে মার্কিন মুদ্রাকে শক্তিশালী করবে। তবে যারা আমদানি-নির্ভর অর্থনীতি পরিচালনা করে, তাদের জন্য শক্তিশালী ডলার ও জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি ভূ-রাজনৈতিক সুবিধার যুগল প্রভাব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়ায়, পাশাপাশি মার্কিন ডলারভিত্তিক বৈদেশিক ঋণের সেবাকরণ ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। ভেনেজুয়েলা যদি যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী শিবির থেকে সরে এসে সরাসরি মার্কিন প্রভাবাধীন অঞ্চলে চলে আসে, তাহলে দেশটির তেল লেনদেনে 'ডি-ডলারাইজেশনের' ঝুঁকি হ্রাস পাবে। একইসঙ্গে, বিকল্প লেনদেন কাঠামো—যেমন চীনা ইউয়ান বা রাশিয়ান রুবল ব্যবহার—করার ক্ষেত্রও সংকুচিত হয়ে পড়বে। দীর্ঘমেয়াদে, এটি 'পেট্রোডলার' ব্যবস্থার ভিত্তিকে আরও মজবুত করবে, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিকারক দেশ এবং তাদের পরিবহন অবকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বিশ্ববাজারে ডলারকে রিজার্ভ ও লেনদেনের প্রধান মুদ্রা হিসেবে সুদৃঢ় অবস্থান বজায় রাখবে। তবে এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য—এই সামরিক অভিযানের মাত্রা এবং এটি বিশ্বের কাছে শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে সম্পদসংক্রান্ত বিরোধ মেটানোর দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হলে—কিছু দেশ, যারা হয় আমদানিকারক, নয়তো রপ্তানিকারক, তারা তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত বৈচিত্র্যময় করতে ও ডলারের বিকল্প সন্ধানে তৎপর হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে দ্বৈত প্রভাব সৃষ্টি হতে পারে: কৌশলগতভাবে ডলারের অবস্থান কিছুটা শক্তিশালী হলেও, দীর্ঘমেয়াদে ধাপে ধাপে ডলারের বিকল্প ব্যবহারের প্রতি আগ্রহ বাড়বে এবং তা 'ডি-ডলারাইজেশন' প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
Read more: https://www.instaforex.com/bd/forex_analysis/434525

Thread: 

