গত তিন দশকে মৎস্যজীবী পরিচয় ছাড়িয়ে বিশ্বের পর্যটকদের অন্যতম সেরা পর্যটন গন্তব্য এখন মালদ্বীপ। পর্যটকদের মূল আকর্ষণ এখানে ‘এক দ্বীপ, এক রিসোর্ট’ নীতিতে পরিচালিত রিসোর্ট আইল্যান্ডগুলো। দ্বীপরাষ্ট্রটির ভ্যালেনা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে নামার পর কাছেই ঘাটে দেখা যাবে অপেক্ষায় বেশ কিছু নৌযান; পর্যটকদের নিয়ে তারা ছুটবে ছোট ছোট দ্বীপগুলোর উদ্দেশে। পর্যটকদের জন্য ওয়াটার বাস আর ফেরিও চলে। নৌকার পাশাপাশি সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে ট্যাক্সিগুলো। ভাড়া নির্ধারিত, তাই কোনো হাঁক-ডাক নেই। হোটেল, রাস্তা, সাগর সৈকত- চারদিক ঝকঝকে, চককচকে। সাগরতীরে বেঞ্চ, দোলনা, ঝুলন্ত বিছানা আছে। সৈকতে বেড়ানার সময় চাইলেই একটু জিড়িয়ে নিতে পারেন পর্যটকরা। সেখানে বিলাসবহুল কোনো রিসোর্ট নেই। তবে সাগরতীর আর রাস্তার পাশে ছোট ছোট হোটেল আর ক্যাফের ছড়াছড়ি। সেখানে থাকতে হলে গুণতে হয় ৭০ থেকে ১০০ মার্কিন ডলার। মালদ্বীপে বেড়াতে খরচের বহরটা বড় হলেও ছোট্ট এই ভূখণ্ডেই প্রতি বছর ছুটে আসেন ভ্রমণপিপাসু কয়েক লাখ মানুষ। ২০১৯ সালে মালদ্বীপকে সেরা পর্যটন গন্তব্য হিসেবেও স্বীকৃতি দেয় বিশ্ব পর্যটন সংস্থা।

যদিও মালদ্বীপ ট্যুরিজম বোর্ড প্রকাশিত ‘ট্যুরিজম ইয়ারবুক ২০২১’ এর হিসাবে, ১৯৭২ সালে মালদ্বীপে পর্যটকদের জন্য হোটেলগুলোতে মাত্র ২৮০টি শয্যা ছিল। ২০২০ সালে এসে তা দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ৮২৭টিতে। ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন রিসোর্ট, হোটেল, গেস্টহাউজ এবং সাফারি নৌযানে এসব থাকার জায়গার ৬২ শতাংশই ভাড়া হয়েছে। তবে মহামারীর কারণে ২০২০ সালে তা ২৫ শতাংশে নেমে আসে। এখানে আসা পর্যটকদের বেশিরভাগই ইউরোপীয়। ২০২০ সালে ৬২ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যটক এসেছেন ইউরোপ থেকে। এশিয়া-প্যাসিফিক থেকে ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। মালে এবং হুলহুমালে এলাকায় দেখা গেল বেশিরভাগ বাড়ি তিনতলা। আশপাশে কোনো আবর্জনা নেই। বাসিন্দারা রাস্তার ওপর নির্ধারিত স্থানে গাড়ি এবং মোটরসাইকেল রেখেছেন। প্রতিটি আবাসিক এলাকার সঙ্গে রয়েছে একটি করে পার্ক কিংবা শিশুদের খেলার জায়গা। নগরে চলাচলের জন্য আছে বাস ও ফেরি। মালদ্বীপের মোট বিদেশি মুদ্রার ৭০ শতাংশ আসে পর্যটন থেকে। এখানে পর্যটনের মূল আকর্ষণ হল রিসোর্ট আইল্যান্ড। “একটি দ্বীপ একটি রিসোর্ট- তারা এই নীতিতেই চলে। এখানকার আইল্যান্ড রিসোর্টগুলোতে সেই কোম্পানির নিজস্ব নিয়ম চলে।মালদ্বীপের সরকারের কাছ থেকে ওই শর্তেই তারা দ্বীপ লিজ নিয়ে রিসোর্ট করেছে। তাদের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় মালদ্বীপ সরকার বা সরকারের কোনো উপাদান কখনোই হস্তক্ষেপ করে না।” ছোট ছোট প্রায় ১২শ দ্বীপ নিয়ে স্থলভাগে ২৯৮ বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত মালদ্বীপ। সাগরের জলভাগসহ এই দ্বীপ রাষ্ট্রিটির মোট আয়তন ৯০ হাজার বর্গ কিলোমিটার। ১ হাজার ১৯২ দ্বীপের মধ্যে মাত্র ১৮৭টিতে বসতি রয়েছে, বসতিহীন ৮৬০টি। এর মধ্যে রিসোর্ট রয়েছে ১৫৯টিতে। “বিশ্বসেরা প্রায় সব হোটেল-রিসোর্ট ব্র্যান্ডই এখানে আছে। মাঝে মাঝে কর্মকর্তারা সেখানে সারপ্রাইজ ভিজিটে যান। অনিয়ম পেলে প্রথমে সতর্ক করা হয়, পরে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এটাই মালদ্বীপের পর্যটন শিল্প বিকাশের মূল কারণ।”