মহামারীর শুরু থেকেই চলছে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা। বিভিন্ন সময় বন্ধের মুখে পড়ছে শিল্পপ্রতিষ্ঠান। বিলম্ব হচ্ছে পণ্যের সরবরাহ। চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে মিলছে না খালি কনটেইনার কিংবা জাহাজও। দুই বছর ধরে চলা এসব প্রতিবন্ধকতা সামুদ্রিক রুটে পণ্য পরিবহন ব্যয়কে রেকর্ড উচ্চতায় নিয়ে গেছে। আর এটি বিশ্বজুড়ে বাড়িয়ে তুলছে মূল্যস্ফীতি। ক্রমবর্ধমান শিপিং ব্যয় এবং ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে চলতি বছরও মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আশঙ্কা করছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। সম্প্রতি নিজেদের ওয়েবসাইটে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে আইএমএফ। ওয়াশিংটনভিত্তিক ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, মহামারীর চ্যালেঞ্জের কারণে ২০২০ সালের মার্চের পর ১৮ মাসে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ব্যয় সাত গুণ বেড়েছে। যেখানে বাল্ক পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়ার হার আরো বেশি। উচ্চ শিপিং ব্যয়ের এ প্রভাব চলতি বছরও অব্যাহত থাকবে এবং ইউক্রেন সংঘাত বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতিকে আরো বাড়িয়ে তুলবে। এদিকে চীনের বাণিজ্যিক নগরী সংহাইয়ে লকডাউন আরোপ করায় সরবরাহ ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতা আরো বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিপিং কোম্পানি মায়েরস্কের আশঙ্কা, সাংহাইয়ের লকডাউন ট্র্যাকিং পরিষেবাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং পরিবহন ব্যয়কে আরো বাড়িয়ে তুলবে। বিশ্বের ব্যস্ততম সমুদ্রবন্দর থাকা শহরটিতে সোমবার থেকে লকডাউন চলছে। সাংহাইয়ের বিমানবন্দর ও গভীর সমুদ্রবন্দর উন্মুক্ত রাখলেও চলাচলে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে বেইজিং। মায়েরস্ক জানিয়েছে, আগামী ৫ এপ্রিল পর্যন্ত পুডং ও পুক্সি অঞ্চলে সম্পূর্ণ লকডাউনের কারণে সাংহাইয়ের ভেতর ও বাইরে যাওয়া ট্র্যাকিং পরিষেবা ৩০ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি সাংহাইয়ের গুদামগুলো আগামী শুক্রবার পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। ফলে সরবরাহ বিলম্ব হবে এবং ব্যয় বেড়ে যাবে বলেও জানায় সংস্থাটি।
এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা ব্যয় ৪০ বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। খাদ্য, পেট্রল ও আবাসনের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কারণে গত মাসে মার্কিন মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে যুক্তরাজ্যের মূল্যস্ফীতির হার ৬ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ভোক্তাদের জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান এ ব্যয় থেকে জনগণকে রক্ষায় নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
Name: news_295048_1.jpg Views: 2 Size: 55.8 KB ID: 17239
বৈশ্বিক ঋণদানকারী সংস্থাটির মতে, বিশ্বের ৮০ শতাংশেরও বেশি বাণিজ্য সমুদ্রপথে ৪০ ফুটের কনটেইনারে সম্পন্ন হয়। এটি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সামুদ্রিক কনটেইনার বাণিজ্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা নির্দেশ করে। শিপিংয়ের হার দ্বিগুণ করার ফলে মূল্যস্ফীতি দশমিক ৭ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে যায়। এর প্রভাব এক বছর পর শীর্ষে ওঠে এবং ১৮ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়। ২০২১ সালে শিপিং ব্যয় বৃদ্ধি চলতি বছর মূল্যস্ফীতিকে প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট বাড়িয়ে তুলতে পারে। উচ্চ শিপিং ব্যয় দুই মাসের মধ্যে আমদানীকৃত পণ্যের দাম বাড়িয়ে তোলে। তবে জ্বালানি পণ্যের ক্ষেত্রে এ প্রভাব কিছুটা ধীর হয়। উচ্চ শিপিং ব্যয় জ্বালানি পণ্যে কয়েক মাস ধরে অনুভূত হয় এবং ১২ মাস পর সর্বোচ্চে ওঠে। আইএমএফের বিশ্লেষণ অনুসারে, মূল্যস্ফীতিতে পণ্য পরিবহন ব্যয়ের প্রভাব ২০২২ সালের শেষ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
গত মাসে আরব বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি মিসরের মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এ হার ২০১৯ সালের মাঝামাঝির পর সর্বোচ্চ। এছাড়া আর্থিক মন্দার মুখোমুখি হওয়া লেবাননের মূল্যস্ফীতি বার্ষিক ২১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। আইএমএফ জানিয়েছে, ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা আরো প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে পারে। এ পরিস্থিতি সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে তুলতে পারে। পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক এ সংকট দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি অব্যাহত রাখতে পারে।