২০২৫ সালে চীনের বৈদেশিক অবকাঠামো অর্থায়ন প্রকল্প বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) আগের বছরের তুলনায় বিনিয়োগ বেড়েছে ৭৫ শতাংশ। বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ২১ হাজার ৩৫০ কোটি ডলারে। বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের দোদুল্যমানতাকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় বিপুল পরিমাণে বিনিয়োগ করছে চীন। মূলত বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এ কৌশল নিয়েছে বেইজিং।
অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটি ও সাংহাইয়ের গ্রিন ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের বিনিয়োগে প্রাধান্য পেয়েছে গ্যাস মেগাপ্রজেক্ট ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি খাত। ২০২৪ সালে ১২ হাজার ২৬০ কোটি ডলার সমমূল্যের ২৯৩টি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল চীন। তবে এক বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালে চুক্তির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫০-এ।
বিআরআই প্রকল্পের আওতায় গত বছর বেশকিছু বড় মেগাপ্রজেক্ট শুরু হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের গ্যাস উন্নয়ন প্রকল্প, নাইজেরিয়ার ওগিডিগবেন গ্যাস ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক ও ইন্দোনেশিয়ার বৃহৎ একটি পেট্রোকেমিক্যাল প্লান্ট। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনা কোম্পানিগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বড় ও শক্তিশালী। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকারও এখন বড় মাপের প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর বেশি আস্থা রাখছে। অবকাঠামো পরিকল্পনাবিদদের এ ক্রমবর্ধমান আস্থা বিআরআই প্রকল্পের পরিধি বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখছে।

বৈশ্বিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে গত বছর খনিজ সম্পদ ও খনি খাতে রেকর্ড ৩ হাজার ২৬০ ডলার বিনিয়োগ করেছে চীন। বিশেষ করে আকরিক প্রক্রিয়াকরণ ও উত্তোলনে বেইজিং এখন বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) তামা আহরণে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং বড় ডাটা সেন্টারগুলোর চাহিদা মেটাতে বিশ্বজুড়ে তামার সংকট দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে তামা ও লিথিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদার্থের দীর্ঘমেয়াদি জোগান নিশ্চিত করতে বিআরআই প্রকল্পকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বেইজিং।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি নিয়ে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই প্রকল্পটিতে বিনিয়োগ বেড়েছে চীনের। বিশ্বজুড়ে সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন ঘটা ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা নিয়ে উদ্বিগ্ন বেইজিং। এ ধরনের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা পেতে এবং আত্মনির্ভরশীল হতে এখন বিকল্প পথ খুঁজছে দেশটি।

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংকট্যাংক ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের বিশেষজ্ঞ ক্রেগ সিঙ্গেলটন মনে করেন, চীন কৌশলগতভাবে এমন দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে, যাদের প্রাকৃতিক সম্পদ বেইজিংকে সাহায্য করবে। মূলত মার্কিন প্রভাবমুক্ত একটি নিজস্ব সরবরাহ চেইন গড়ে তোলাই লক্ষ্য দেশটির। যেকোনো বড় সংকট আসার আগেই বহিঃশক্তির চাপ কমানোর জন্য বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি বেইজিংয়ের একটি বড় পদক্ষেপ।

২০১২ সালে শি জিনপিং প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় আসার পর প্রকল্পটি শুরু হয়। এতে চীন এখন বিশ্বের বৃহত্তম দ্বিপক্ষীয় ঋণদাতায় পরিণত হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১৫০টি দেশ বিআরআই প্রকল্পের অংশীদার। শুরু থেকে এ পর্যন্ত এ প্রকল্পের অধীনে মোট চুক্তির পরিমাণ ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।

চীনের বড় আকারের এ বিনিয়োগের বিপরীতে পশ্চিমা দেশগুলো এবং মার্কিন কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিস (সিআরএস) কিছু উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। তাদের মতে, অনেক দেশে ঋণের বোঝা অসহনীয় হয়ে উঠছে। এছাড়া ঋণের শর্তাবলি এবং স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কৌশলগত অবকাঠামোয় চীনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ পরবর্তী সময়ে বেসামরিক ও সামরিক ক্ষেত্রে ঝুঁকির কারণ হতে পারে বলেও অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।

সব সমালোচনা ও ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পে চীনের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫ সালের রেকর্ড বিনিয়োগ প্রমাণ করে যে বেইজিং তাদের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব আরো বিস্তৃত করতে বদ্ধপরিকর।

বিভিন্ন সমালোচনা ও ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের কার্যক্রম এগিয়ে চলছে।

বিশেষজ্ঞরা পূর্বাভাস দিয়েছেন, ২০২৬ সালেও জ্বালানি, খনি ও নতুন প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের এ ধারা অব্যাহত থাকতে পারে। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বেইজিংয়ের অবস্থান আরো শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।