নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলে মূল্যস্ফীতি আরো উসকে ওঠার শঙ্কা
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্যে প্রায় দুই বছর ধরে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে ধরে রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর প্রভাবে ব্যাংক ঋণের সুদহার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪-১৫ শতাংশে। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ সুদহার কার্যকর থাকলেও মূল্যস্ফীতি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিয়ন্ত্রণে আসেনি, বরং দেশের অর্থনীতিতে চলছে বিনিয়োগ খরা। পরিস্থিতি উত্তরণে সুদহার কমানোর দাবি জানিয়ে আসছেন ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা যদিও তাদের এ দাবি উপেক্ষা করেই নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখে মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) জন্য গতকাল নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর এ মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন। অনুষ্ঠানে গভর্নর বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি প্রত্যাশিত মাত্রায় নামিয়ে আনা ছাড়া বাকি সূচকগুলোতে মুদ্রানীতি সফল হয়েছে। অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে আমরা খুব ভালো করেছি; শুধু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছি। কর আহরণ না বাড়িয়ে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করলে সরকারের ব্যাংক ঋণের চাপ আরো বাড়বে। এটি মূল্যস্ফীতিকে আরো উসকে দিতে পারে।’
এ আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়েছে ঘোষিত মুদ্রানীতি বিবরণীতেও। তাতে বলা হয়, সরকারের পক্ষ থেকে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। রমজান মাসও শুরু হতে যাচ্ছে। এসব পরিস্থিতি চাহিদা ও ভোক্তা ব্যয় বাড়ায়, যা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
দেশের বেসরকারি খাতে কয়েক বছর ধরেই বিনিয়োগ স্থবিরতা চলছে। তবে চলতি অর্থবছরে এসে তা আরো তীব্র হয়। গত জুলাইয়ে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছিল মাত্র ৭ দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু গত ডিসেম্বর পর্যন্ত এ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬ দশমিক ১ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখা হলেও নজিরবিহীন এ বিনিয়োগ স্থবিরতা কিছুটা কাটিয়ে উঠতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য নতুন মুদ্রানীতিতে আগামী জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৮ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে অর্থবছরের শুরুতে জুন পর্যন্ত ৮ শতাংশ অর্জনের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিতে স্থবিরতা চললেও সরকার তার ঘোষিত লক্ষ্যের চেয়েও ব্যাংক খাত থেকে বেশি ঋণ নিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে মুদ্রানীতিতে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য বাড়ানো হয়েছে। বেসরকারি খাতে যেখানে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে সাড়ে ৮ শতাংশ, সেখানে সরকারি খাতে এ লক্ষ্য ২১ দশমিক ৬ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ বেসরকারি খাতের তুলনায় ব্যাংক থেকে তিন গুণ ঋণ নেবে সরকার। আর মুদ্রা সরবরাহ বা ব্রড মানির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ৭ দশমিক ৮০ শতাংশ থাকলেও অর্জিত হয়েছে ৯ দশমিক ৬০ শতাংশ। নতুন মুদ্রানীতিতে আগামী জুনে এটি ১১ দশমিক ৫০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ হয়েছে। মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ৪৭২ কোটি ডলার কেনায় প্রায় ৫৮ হাজার কোটি টাকা বাজারে ঢুকেছে। এ কারণে মুদ্রা সরবরাহে উচ্চ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জানানো হয়।
মুদ্রানীতি ঘোষণার শুরুতে ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীল সরকার এলে বেসরকারি খাতে ঋণ চাহিদা বাড়বে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আইএমএফ লক্ষ্যমাত্রার অনেক ওপরে রয়েছে। সংস্থাটির সব ধরনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের দিক থেকে।’
মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা ছাড়া বাকি সব সূচকে মুদ্রানীতি সফল হয়েছে দাবি করে গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘আমরা খুব ভালো করেছি, শুধু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছি। এটাও কমবে। সামনের দিনগুলোয় অর্থনীতি আরো ভালো করবে। একটি লক্ষ্য পূরণ হয়নি বলে সব অর্জন অস্বীকার করা ঠিক নয়। তাই এ মুহূর্তে নীতি সুদহার কমানো হবে না।’
নীতি সুদহার বেশি রাখার কারণে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে দাবি করে গভর্নর বলেন, ‘এর সুফল এখন পাওয়া যাচ্ছে। রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ছে। মার্কেট বুস্ট করার জন্য স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) কমানো হয়েছে। মার্কেটে টাকার প্রবাহ বাড়বে। ভবিষ্যতে আরো কমানো হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকা রাখার জায়গা না।’
সংস্কার ইস্যুতে নিজের আক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন ড. আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, ‘গভর্নর হিসেবে এ সরকারের আমলে আমি পূর্ণ পেশাদার স্বাধীনতা ভোগ করেছি, কোনো চাপ ছিল না। তবে কিছু আইন সংশোধন না হওয়ায় আমার আক্ষেপ রয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার, ব্যাংক কোম্পানি আইন এবং অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধনের প্রস্তাব দেয়া হলেও তা শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠেনি।’
গভর্নর বলেন, ‘আমরা পরবর্তী সরকারের কাছে বিষয়টি উপস্থাপন করব। জাতির স্বার্থে হলেও এটি করা উচিত। এটি বাস্তবায়ন করতে না পারলে অতীতে যেভাবে ব্যাংক খাত অপব্যবহার ও লুটপাটের শিকার হয়েছিল, তা আবার ফিরে আসতে পারে। ব্যাংক কোম্পানি অর্ডার বাস্তবায়ন হলে রাজনৈতিক চাপ প্রতিহত করা সম্ভব হবে।’
তিনি বলেন, ‘রাজনীতিবিদরা স্বল্পমেয়াদে দ্রুত অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে চান, আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব হলো টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা, যা আমরা যুক্তরাষ্ট্রের উদাহরণে দেখি। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর কোনো ধরনের রাজনৈতিক চাপ যেন না আসে এবং অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা যেন নষ্ট না হয়। শৃঙ্খলা এখনো পুরোপুরি আসেনি, কিন্তু সেটি ফিরে পাওয়ার পর যদি আবার হারিয়ে ফেলি, তাহলে তা হবে দুর্ভাগ্যজনক।’
পরবর্তী সরকারের সময় সংস্কারকাজ এগিয়ে নিতে না পারলে তিনি দায়িত্বে থাকবেন কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘সেটা তখন বোঝা যাবে। সেতুর কাছে গিয়ে বলা যাবে সেতু পার হব কিনা। তবে যে সরকারই আসুক, আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করতে হবে।’
আইএমএফের সব শর্ত বাংলাদেশ পূরণ করেছে জানিয়ে গভর্নর বলেন, ‘চার বছরে আইএমএফ যে পরিমাণ ঋণ দেয়ার কথা, তার চেয়েও বেশি ডলার কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভে কিনেছে। আমরা অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে চাই না।’

Thread: 

