মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের প্রায় ১২ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বের হতে পারবে না।
চলতি অর্থবছর (২০২৫-২৬) শেষে ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমা থেকে বের হতে পারে বলে ধারণা করা হলেও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ, মূল্যস্ফীতি, ক্রয়ক্ষমতা হারানো, নতুন কর্মসংস্থানের অভাব ও শ্রম আয়ের দুর্বল প্রবৃদ্ধির কারণে মাত্র পাঁচ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বের হতে পারে। তবে যুদ্ধাবস্থা দীর্ঘমেয়াদি না হলে দারিদ্র্য নেমে আসবে ২০ দশমিক ৯ শতাংশে। এদিকে দেশের অর্থনীতিতে নানামুখী ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বছর শেষে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে। গতকাল ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনের এপ্রিল সংস্করণ প্রকাশ করে বিশ্বব্যাংক। এতে এসব পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে দেশের অর্থনীতিতে তীব্র সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ এবং উচ্চমাত্রার অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল থাকায় ক্রমবর্ধমান শ্রমশক্তির জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যাচ্ছে না।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে (২০২৫) দারিদ্র্যের হার ২১ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০২২ সালে এ হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। এ সময়ে নতুন করে ১৪ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের আগে ধারণা করা হয়েছিল চলতি বছর ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠবে। যুদ্ধের কারণে সেটি পাঁচ লাখে নেমে এসেছে। তবে যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি না হলে ২০২৭ সালে দারিদ্র্যের হার নেমে আসতে পারে ২০ শতাংশে। ২০২৮ সালে নামবে ১৯ দশমিক ৩ শতাংশে। প্রতিবেদনে দারিদ্র্য বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, শ্রমের কম মজুরি ও কর্মসংস্থানের নিম্নগতি। যুদ্ধের কারণে শ্রম খাতে বৈষম্য বাড়বে এ পূর্বাভাসও দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির মতে, ইরান যুদ্ধে এ বছর দারিদ্র্যের হার কমবে মাত্র দশমিক ৭ শতাংশ। প্রতি বছর গড়ে ১ শতাংশের বেশি হারে দারিদ্র্য কমে।
গতকাল বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর (বাংলাদেশ ও ভুটান) জ্যঁ পেম বলেন, ‘বাংলাদেশের দরিদ্রতা কমার প্রবণতা রয়েছে। তবে নতুন কর্মসংস্থান সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতির ফলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় দরিদ্রতা বাড়তে পারে। যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের কারণে বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া দারিদ্র্য কমার গতি কমেছে। এখান থেকে উত্তরণে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বিনিয়োগ পরিবেশ সহজ করা জরুরি।’
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সামনে চারটি কঠিন পরিস্থিতি রয়েছে। তা হচ্ছে দুর্বল প্রবৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য বৃদ্ধি ও আর্থিক খাতের চাপ। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাব দেশের অন্তত ছয়টি খাতে পড়তে পারে। তা হচ্ছে চলতি হিসাবের ভারসাম্যের স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে। কারণ আমদানি-রফতানি, প্রবাসী আয়, টাকার অবমূল্যায়নে প্রভাব পড়তে পারে। ভোগব্যয় ও বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাবে জিডিপির প্রবৃদ্ধিতে টান পড়তে পারে। জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহনের খরচ বেড়ে গেলে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়তে পারে। ১২ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে পারে। আর্থিক চাপ বাড়তে পারে, শ্রম বৈষম্য বাড়তে পারে এবং ২০২৬ সালে গিনি সূচক দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে।
যুদ্ধের এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে, যা মোকাবেলায় শক্তিশালী নীতি ও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। এক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন রাজস্ব বৃদ্ধি করা, কঠোর মুদ্রানীতি, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন। এছাড়া রফতানি বাড়ানো, রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি ও বিনিময় হার বাড়ানোও দরকার।
এদিকে বিশ্বব্যাংক চলতি অর্থবছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। জানুয়ারিতে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে জানালেও যুদ্ধের কারণে কমিয়ে আনা হয়েছে। তবে তাদের দাবি যুদ্ধ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ২০২৭ সালে ৪ দশমিক ৬ এবং ২০২৮ সালে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে। দেশের অর্থনীতি ঝুঁকিতে থাকলেও প্রতিবেদনে চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫ শতাংশ থাকবে বলে ধারণা করা হয়েছে।
প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ অর্জনই অনেক বড় হবে বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশ যদি ৩ দশমিক ৯ অর্জন করতে পারে এটি খুবই ইতিবাচক। কারণ এ সময়ে যে জ্বালানি সংকটের ধাক্কা খেল সেটি আগের তিনবারের সংকটের যোগফলের তুলনায় বেশি। প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে সূচকগুলো আছে সেগুলোর মধ্যে শুধু রেমিট্যান্স সব ক্ষেত্রে নেতিবাচক খবর। ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, রফতানি নেতিবাচক, আমদানিতে উৎপাদনে এলসি সেটলমেন্টের গতিও কম। সেখানে উন্নয়নশীল দেশের গড় ৪ শতাংশের জন্য স্বাভাবিক। এখন অস্বাভাবিক অবস্থা সেখানে এটি করতে পারাই বড় অর্জন।’
তবে বিশ্বব্যাংক আশা প্রকাশ করেছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে এবং কাঠামোগত সংস্কারে দ্রুত অগ্রগতি হলে অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে। সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, রাজস্ব বাড়ানো, আর্থিক খাত শক্তিশালী করা এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে জরুরি সংস্কারের ওপর জোর দেয়া হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র অর্থনীতিবিদ ধ্রুব শর্মা বলেন, ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দ্রুত বাড়তে থাকা কর্মশক্তিকে কাজে লাগাতে এবং প্রবৃদ্ধি টেকসই রাখতে ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন করতে হবে। নিয়মনীতির অনিশ্চয়তা কমানো, প্রতিযোগিতা বাড়ানো এবং উদ্যোক্তাদের বাধা দূর করা গেলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়বে।’

Thread: 

