পৃথিবী এক মহান জাদুকর। এটি এমন কিছু চমক তৈরি করে যা দেখলে মনে হয় যেন পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মই ভুল। বিরল অপটিক্যাল প্রভাব, চিরন্তন ঝড়, লাল বরফ—এসব কোনো কিছুই সাইন্স‑ফিকশনের দৃশ্য নয়। এগুলো প্রকৃতির বিশেষ প্রক্রিয়া, যেখানে বিজ্ঞানই এই জাদুর পেছনের রহস্যের সমাধান সরবরাহ করে। এই ধরনের প্রক্রিয়াগুলো বিরল ও অস্থায়ী; এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট উচ্চতা, ঠাণ্ডা আবহাওয়া, রসায়ন বা ভূতত্ত্বের সূক্ষ্ম সমন্বয় প্রয়োজন। নিচে এমনই কয়েকটি অদ্ভুত ঘটনার বর্ণনা দেয়া হলো।
অ্যান্টার্কটিক ব্লাড ফলস — গ্লেসিয়ার থেকে লাল স্রোত
টেলর ভ্যালির ব্লাড ফলস কিন্তু প্রকৃতপক্ষে রক্ত নয়। এটি এক ধরনের অতিলবণাক্ত পানি। এই পানি মূলত আয়রন অক্সাইড সমৃদ্ধ বরফের ফাটল থেকে চুইয়ে বেরিয়ে আসা লবণাক্ত পানি। প্রায় দুই মিলিয়ন বছর আগে একটি প্রাচীন হ্রদ বরফের নিচে আটকে পড়ে। ওই পানি সালফেট ও আয়রন সমৃদ্ধ ছিল। যখন আয়রন বায়ুর সংস্পর্শে আসে, তা অক্সিডাইজ হয়ে মরিচা‑লাল রং ধারণ করে। এই লাল ঝরনা একই সঙ্গে প্রকৃতির অদ্ভূত রূপের জানান নেয় : ওই পানিতে এমন কিছু ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্ জীব থাকে, যারা অক্সিজেন ছাড়াই সালফেটের শ্বাসপ্রশ্বাস গ্রহণ করে। বৈজ্ঞানিকরা ১৯১১ সালে প্রথম এ বৈশিষ্ট্যের সন্ধান পায় এবং অতি সম্প্রতি আয়রনের রং সংক্রান্ত রাসায়নিক রহস্য উন্মোচিত হয়েছে।
ক্যাটাতুম্বো লাইটনিং — যখান প্রকৃতি আলো নেভাতে ভুলে যায়
ভেনেজুয়েলার কাছাকাছি ক্যাটাতুম্বো নদীর মুখে লেক ম্যারাকাইবোতে প্রায় অবিরত এক ধরনের ঝড় বয়ে যায়। বছরে প্রায় ২৮০ রাত পর্যন্ত সেখানে বজ্রপাত হয় এবং এক রাত্রিতে ১০,০০০ পর্যন্ত বজ্রপাত হতে পারে। ক্যারিবিয়ান অঞ্চল থেকে আসা উষ্ণ, আর্দ্র বায়ু আন্দিজ পর্বতমালা থেকেই নামা শীতল বাতাসের সঙ্গে ধাক্কা খায়, ফলে মেঘ থেকে বজ্রপাত তৈরির প্রায় নিখুঁত সম্ভাবনা তৈরি হয়। বিদ্যুৎ ঝলকগুলো প্রায়শই দূরবর্তী অঞ্চলে হয় ও প্রায় নিরব থাকে, তবু এটি আকাশকে ক্রমাগত আলোকিত করে রাখে। অঞ্চলটিতে পৃথিবীর অন্যান্য যেকোনো জায়গার তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণ ওজোন গ্যাস উৎপাদিত হয়।
পেনিটেন্টেস — বরফের তীর্থযাত্রী সন্ন্যাসীর বাহিনী
আন্দিজ ও হিমালয় পর্বতের ৪০০০ মিটার উপরে তুষার হাজার হাজার ধারালো বরফ শিখরে পরিণত হয়, যেগুলোতে দেখতে টুপি পরা সন্ন্যাসীদের মতো লাগে। এসব বরফের গঠন এক থেকে পাঁচ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয় এবং দেখতে যেন প্রার্থনার মাঝেই হঠাৎ করে জমে যাওয়া একদল সৈন্য মনে করায়। পেনিটেন্টেস গঠিত হয় সাবলাইমেশন প্রক্রিয়ায়—সূর যালোক বরফকে সরাসরি বাষ্পে পরিণত করে, আর শীতল ছায়া বরফের ব্লেডগুলোর মধ্যে ঠাণ্ডা ধরে রাখে। এই গঠনগুলোর কারণে পর্বত আরোহণ আরও কঠিন হয়ে পড়ে এবং পুরো অঞ্চল ভয়ানক পিচ্ছিল হয়ে যায়। পেনিটেন্টেসের মাধ্যমে দেখা যায় যে শুষ্ক, ঠাণ্ডা ও তীব্র অতিবেগুনি বিকিরণ কী রকম ভাস্কর্য তৈরি করতে পারে।
অরোরা বোরিয়ালিস — আকাশে চার্জড পার্টিকেলের নৃত্য
অরোরা বোরিয়ালিস যেন এক বিশাল প্লাজমা পারফরম্যান্স। সোলার বায়ু থেকে আগত চার্জড পার্টিকেলগুলো পৃথিবীর ম্যাগনেটোস্ফিয়া ় আঘাত করে এবং বায়ুমণ্ডলের গ্যাসের সঙ্গে সংঘর্ষে আলো সৃষ্টি হয়। অক্সিজেনের মাধ্যমে সবুজ ও লাল আলো উৎপাদিত হয়; নাইট্রোজেন বেগুনি ও নীল আলো তৈরি করে। ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়ের সময়, যখন সূর্য বিশেষভাবে শক্তিশালী রশ্মি নিঃসরণ করে, তখন এই অরোরা আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। নরওয়ে, আইসল্যান্ড ও আলাস্কায় শীতের সময় দীর্ঘ রাত্রি ও স্বল্প লাইট পলিউশনের কারণে এই সকল রশ্মি দৃশ্যমান হয়— যেখানে মুকুট, ফিতা ও শৈবালাকৃতির আলোক নৃত্য দেখা যায়।
জলপ্রপাতের পিছনে চিরন্তন শিখা — যে আগুন ডোবে না
নিউ ইয়র্কের চেস্টনাট রিজ পার্কে ইটারনাল ফ্লেম ফলস নামক দশ মিটার উঁচু ঝর্ণার পিছনে একটি ছোট প্রাকৃতিক গ্যাস শিখা জ্বলছে। এই শিখার উচ্চতা প্রায় ২০ সেন্টিমিটার এবং এটি কয়েক শত বছর ধরেই জ্বলছে। মিথেন গ্যাস পাথুরে ফাটলের মধ্য দিয়ে আগুন হয়ে বেরিয়ে আসে এবং প্রাকৃতিকভাবেই জ্বলে ওঠে। পানির কারণে এই শিখাটি নিভে যায় না কারণ একটি পাথর ঝর্ণার সরাসরি পানি থেকে সেটিকে আড়াল করে রাখে। যখন ভূতাত্ত্বিক গ্যাস প্রবাহ ও পানিপ্রবাহের মধ্যে সংঘর্ষ হয়, তখন আগুন ও পানির এই বিরল মিলন ঘটে। স্থানীয় আদিবাসীরা এই স্থানকে পবিত্র হিসেবে গণ্য করে।
অগ্নি রংধনু — আকাশে আগুনের জ্বলজ্বলে শিখা
সার্কামহরাইজোন্ট ল আর্ক হল সূর্য ৫৮ ডিগ্রি থেকে উপরে উঠলে একটি উজ্জ্বল অনুভূমিক রংধনু দেখা যায়। সূর্যের আলো সেরুস মেঘের ফ্ল্যাট, হেক্সাগোনাল বরফ ক্রিস্টার হয়ে ভেঙে যায় এবং লালরঙয়ের এক শিখা তৈরি করে। এটা রংধনু নয় এবং আবার আগুনও নয়—এটি একটি বায়ুমণ্ডলীয় অপটিকাল উৎসব। এই প্রাকৃতিক রঙের প্রদর্শন কয়েক মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হয় এবং ক্রিস্টালগুলোর সুষম বিন্যাসেরও প্রয়োজন আছে। এটি গ্রীষ্মকালে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের ওপর সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। একটি অগ্নি রঙধনু দর্শককে জাদুর মতো অনুভূতি—আকাশে হঠাৎ করে যেন তরল আগুন জ্বলে ওঠে।
লাইট পিলার — শূন্য থেকে ওঠা আলোক রশ্মি
লাইট পিলার হচ্ছে এক ধরনের অপটিক্যাল কলাম, যা আলোর উৎস থেকে উপরে উঠে বা নিচে নামে। বায়ুতে ভাসমান সমতল বরফের ক্রিস্টাল রাস্তার বাতি, চাঁদ বা সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে এই প্রভাব সৃষ্টি করে। চরম শীতল অঞ্চলে এগুলো এমন দৃষ্টিভ্রম সৃষ্টই যে যেন লম্বা আলোর তরবারি আকাশকে ছিদ্র করে চলে যাচ্ছে। এই পিলার অধিকাংশ সময় মেরু অঞ্চলে দেখা যায় বা যখন বায়ুতে অনেক কণা থাকে তখনও এটি পরিলক্ষিত হয়। কৃত্রিম আলোও এই ঘটনাকে উদ্দীপিত করতে পারে, তবু এটি অনেকটা অতিপ্রাকৃত ঘটনার মতোই মনে হয়। লাইট পিলার একটি সাধারণ রাতকে মহাজাগতিক এক প্রদর্শনীতে পরিণত করে।

Thread: 

